মোস্তফা জাহেদ: চট্টগ্রাম শহরজুড়ে নকল ঔষধের দৌরাত্ম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।একদিকে রোগীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উপর ভরসা হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। জীবনরক্ষাকারী ঔষধের মতো স্পর্শকাতর পণ্য নিয়েও চলছে অসাধু ব্যবসায়ীদের ভয়ঙ্কর কারসাজি। লাভের মোহে তারা এমন এক পথ বেছে নিয়েছে যার পরিণতি প্রাণঘাতী হতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শে রোগী যখন ফার্মেসিতে যান ঔষধ কিনতে, তখন তার একটাই আশা—শারীরিক আরোগ্য। কিন্তু সেই আশায় গুড়েবালি দিচ্ছে নকল ঔষধ। বিশেষ করে শিশু ও মা–বাবুরোগীদের ক্ষেত্রে এই নকল ঔষধের প্রভাব আরও মারাত্মক হয়ে উঠছে। অনেকেই সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন কিংবা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতাল এলাকায় সম্প্রতি একটি ফার্মেসিতে অভিযান চালিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বিপুল পরিমাণ নকল বিদেশি ঔষধ জব্দ করে। অভিযানে ধরা পড়ে, নামি ব্র্যান্ডের লোগো ও মোড়কে নকল ঔষধ বাজারজাত করা হচ্ছে, যা সাধারণ ভোক্তার পক্ষে চিহ্নিত করা অসম্ভব।
এখানেই থেমে নেই ভয়াবহতা। অভিযোগ উঠেছে, বড় ওষুধ কোম্পানির কিছু অসাধু বিক্রয় প্রতিনিধি অধিক কমিশনের লোভে নকল ঔষধ ফার্মেসিগুলোতে সরবরাহ করছে। এসব চক্র অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করছে, যার ফলে প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে বহুদিন ধরেই বাজার দখল করে রেখেছে তারা।
নকল ঔষধ তৈরি ও বাজারজাতকরণে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। ফলে এসব ঔষধের মোড়ক ও গায়ে থাকা বারকোড বা ব্যাচ নম্বর দেখে সত্যিকারের ঔষধের সঙ্গে পার্থক্য করা প্রায় অসম্ভব। অনেক সময় দেখা যায়, চিকিৎসক প্রেসক্রিপশনে যে ব্র্যান্ড উল্লেখ করেন, রোগী ফার্মেসি থেকে সেই নামের ঔষধ সংগ্রহ করেও প্রতারিত হন, কারণ সেটি হয় নকল অথবা নিম্নমানের।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও র্যাব চট্টগ্রামে একাধিক অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি ফার্মেসি ও গুদাম থেকে নকল ঔষধ জব্দ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে দোকানিকে মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে—শুধু জরিমানা বা সতর্ক করলেই কি বন্ধ হবে এ ভয়ঙ্কর অপরাধ?
ভোক্তাধিকার চট্টগ্রামের উপ পরিচালক মো: ফয়েজ উল্লাহ বলেন, কয়েকদিন আগে মা শিশু হাসপাতালের একটি ফার্মেসীতে নকল ওষুধ বিক্রির অভিযোগে জরিমানা করা হয়। বিভিন্ন সময় মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ এবং নকল ওষুধ বিক্রির অভিযোগে ব্যবসায়ীদের কে জরিমানা আদায়ের পাশাপাশি সতর্ক করা হচ্ছে।
প্রতি নিয়ত ঔষধের দোকানগুলোতে নজরে রাখার চেষ্টা রয়েছে আমাদের। নামি দামি হাসপাতাল গুলোর ফার্মেসীতে নকল ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ বিক্রির অভিযোগে অভিযান করে জরিমানার আওতায় আনা হয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা অতি লাভের আশায় সাধারণ মানুষের ক্ষতি করছে। নকল ঔষধ ঢেকাতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অপরাধ রোধে প্রয়োজন গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ঔষধ ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা এবং নকল ঔষধ উৎপাদক ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ বাদল শিকদার জানান, ভেজাল নকল ঔষধ ঠেকাতে নজরদারি বা তদারকি কার্যক্রম আমাদের রুটিন কাজ। এই মাসেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার আওতায় এনেছি। আমরা সরাসরি অভিযান পরিচালনা করতে পারি না আমাদের সেই ক্ষমতা নেই। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অভিযান চালানো হয়। ডিসি স্যারের নির্দেশনা রয়েছে আগে ব্যবসায়ীদের মতবিনিময়ের মাধ্যমে সর্তক করা। আমরা অভিযানের আগে সর্তক করে পরে অভিযান পরিচালনা করি। জনস্বার্থে আমাদের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
চট্টগ্রামের একাধিক ফার্মেসি ঘুরে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ নকল ও আসল ঔষধের পার্থক্য বুঝতেই পারছেন না। একজন রোগীর স্বজন জানালেন, “আমরা তো প্রেসক্রিপশন দেখে ঔষধ কিনি। দোকানি যা দেয়, তাই বিশ্বাস করে নিয়ে যাই। এখন জানলাম, এসব নকল ঔষধ শরীরের আরও ক্ষতি করছেনগরীর বহদ্দারহাট এলাকার একজন ফার্মাসিস্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের উপর কোম্পানির প্রতিনিধিরা চাপ দেয় বিশেষ কিছু ঔষধ বিক্রির জন্য। কমিশন বেশি দিলে কেউ না কেউ লোভে পড়ে। সমস্যা হলো, সব ঔষধ যাচাই করার ক্ষমতা আমাদের নেই।”
এখানে প্রশ্ন উঠে আসে, বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঠিক কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে? নকল ঔষধের এমন বিস্তার যদি শহরের প্রাণকেন্দ্রে ঘটে, তাহলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থা কী?
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের ওষুধ প্রশাসনকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর এবং সক্রিয় হতে হবে। উন্নত দেশে ঔষধে QR কোড বা ভেরিফিকেশন বারকোড থাকে, যা মোবাইল অ্যাপে স্ক্যান করে তাৎক্ষণিকভাবে আসল-নকল যাচাই করা যায়। বাংলাদেশেও এই ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
নকল ঔষধ বন্ধে কঠোর আইন ও তার বাস্তবায়নের দাবিতে ইতোমধ্যে একাধিক মানবাধিকার সংগঠন বিবৃতি দিয়েছে। তারা বলছে, “এটি কেবল ব্যবসায়িক অপরাধ নয়, এটি মানবতা বিরোধী অপরাধ। যারা জনগণের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।”
সচেতন নাগরিক, প্রশাসন, স্বাস্থ্যখাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যম—সব পক্ষকেই এ সমস্যার সমাধানে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। যার করণীয়গুলো হতে পারে:
নকল ঔষধ চিহ্নিত করার জন্য প্রযুক্তিভিত্তিক ভেরিফিকেশন সিস্টেম চালু করা, গোয়েন্দা নজরদারি ও হঠাৎ অভিযান আরও বাড়ানো, ঔষধ প্রশাসনের তদারকি বাড়ানো এবং জনবল বৃদ্ধি, ফার্মেসিগুলো লাইসেন্স রিভিউ এবং নিয়মিত মনিটরিং, সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানো, কঠোর শাস্তির বিধান কার্যকর করা।
চট্টগ্রামের নকল ঔষধ কেলেঙ্কারি কেবল একটি শহরের সংকট নয়, এটি জাতীয় সংকটের পূর্বাভাস। মানুষের জীবনের সঙ্গে এভাবে প্রতারণা চলতে থাকলে স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির ভয়াবহ পরিণতি আমাদের ভুগতে হবে দীর্ঘদিন। এখনই সময় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের—না হলে ভবিষ্যত আরও অন্ধকার।
ভোক্তারা ঔষধ কেনার সময় ভালো ফার্মেসি থেকে ক্রয় করুন, প্রয়োজনে প্যাকেটের গায়ে থাকা তথ্য যাচাই করুন এবং সন্দেহজনক কিছু মনে হলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান।
| ফজর | ৪:০৯ - ৫:২৮ ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১১:৫৯ - ৪:৩১ দুপুর |
| আছর | ৪:৩২ - ৬:২৫ বিকাল |
| মাগরিব | ৬:২৭ - ৭:৪৫ সন্ধ্যা |
| এশা | ৭:৪৬ - ৪:০৮ রাত |
| জুম্মা | ১.৪০ মিনিট দুপুর |